দেশে – বিদেশে ছোট পুঁজিতে গড়ে তোলা বড় ব্যবসার অনেক উদাহরণ আছে August 19, 2019 BD Business & Economy, BD Investment, BD News, BD Success Story, Career, Child Corner, Economy, Exclusive (বিচিত্র), Feature, Global Biz & Economy, Global Investment, Lifestyle, News, Success Story, World News, World Success Story

আকিজ গ্রুপ:
পারিবারিক অসচ্ছলতার জন্য শৈশবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন করতে পারেননি শেখ আকিজ উদ্দিন। ১৩ বছর বয়সে পকেটে মাত্র ১৬ টাকা নিয়ে নিজ গ্রাম ছেড়ে কলকাতা চলে যাওয়ার পর শিয়ালদহ স্টেশনে কয়েক সপ্তাহ খোলা আকাশের নিচে দিন কেটেছিল তাঁর। একসময় হাওড়া ব্রিজের কাছে কমলা প্যাডলিং থেকে সঞ্চয় করা স্বল্প অর্থ দিয়ে একটি মুদি দোকানের ভ্যান কিনে ব্যবসা শুরু করেন। ওই ভ্যানে তিনি বিভিন্ন পণ্য মাত্র ৬ পয়সায় বিক্রি করতেন। অবৈধভাবে দোকান খোলার অপরাধে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে ৩ দিন আটকে রাখে। পরবর্তী সময়ে ১৯৫২ সালে বিজরডাঙ্গা রেলস্টেশনে দোকান খুলে তিনি তামাক বিক্রি শুরু করেন, যা পরে দেশের বৃহত্তম একটি কোম্পানিতে পরিণত হয়।

অ্যাপল:
১৯৭০-এর দশকের কথা। ব্যক্তিগত কম্পিউটার তৈরি ও বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিলেন স্টিভ জবস ও স্টিভ ওজনিয়াক। কিন্তু এই কাজের জন্য যে পরিমাণ টাকা দরকার ছিল, তার কিছুই এই দুজনের ছিল না। সম্পদ বলতে যা ছিল তা হলো ওজনিয়াকের এইচপি ক্যালকুলেটর ও জবসের ভক্সওয়াগন ভ্যান। এই সম্পদ বিক্রি করে যে ডলার পাওয়া গেল, তা দিয়ে শুরু হয় অ্যাপলের যাত্রা। অ্যাপল আই তৈরির জন্য তাঁরা কম্পিউটার বানিয়েছিলেন একটি ভাড়া করা গ্যারেজে। কে জানত, গ্যারেজ থেকে শুরু হওয়া একটি প্রতিষ্ঠান একদিন বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি হয়ে উঠবে! অ্যাপলের প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে আরও একজন ছিলেন। তিনি রোনাল্ড ওয়েইন। মাত্র ৮০০ ডলারে তিনি তাঁর শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছিলেন!

ওয়ালমার্ট :
ওয়ালমার্টের প্রতিষ্ঠাতা স্যাম ওয়ালটন যখন তাঁর প্রথম দোকানটি চালু করেন, তখন সালটা ১৯৪৫। সদিচ্ছা ছাড়া পুঁজি বলতে তাঁর আর তেমন কিছুই ছিল না। প্রাথমিকভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে পণ্য ক্রয়ের জন্য তিনি তাঁর শ্বশুরের থেকে ২৫ হাজার ডলার ঋণ নেন। এই ঋণ দিয়ে ব্যবসা শুরুর প্রথম দিকেই তাঁর দোকান সাফল্যের মুখ দেখে। ১৯৬২ সালে চালু হওয়ার পর ১৯৭৬ সালের মধ্যেই এই প্রতিষ্ঠানটির মূল্য দাঁড়ায় ১৭৬ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি। ২৩ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের জোগান দেওয়া স্যাম ওয়ালটন একসময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ধনী হিসেবে বিবেচিত হন। তিনি মারা গেছেন ১৯৯২ সালে। এখন বিশ্বের ২৭টি দেশে ওয়ালমার্টের ১১,২৭৭ টি দোকান আছে।

ইফাদ গ্রুপ:
ইফতেখার আহমেদ টিপু। একজন আত্মপ্রত্যয়ী, দৃঢ়চেতা, প্রাজ্ঞ, প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতি। সততা, মেধা, নিষ্ঠা, অধ্যবসায় এবং দূরদৃষ্টির কারণে
ইফাদ গ্রুপ আজ উন্নতির শিখরে। সততা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, যদি এমন কোনো বড় ব্যবসায়ীর নাম বলা হয় তাদের মধ্যে তিনি একজন।ইন্ডাস্ট্রিয়াল এবং ব্যাংকিং সেক্টরেও তার সুনাম ও গ্রহণযোগ্যতা সর্বজনবিদিত। আজ থেকে ৩০ বছর আগে যাত্রা শুরু করেছিলেন একটি ছোট ট্রেডিং কোম্পানি দিয়ে। পুঁজি ছিল মাত্র ৩ লাখ টাকা। এখন গ্রুপের কোম্পানির সংখ্যা ৯টি।কাজ করছেন ৭ হাজার কর্মী। বিদেশে পণ্য রপ্তানি করে আয় করছেন বৈদেশিক মুদ্রা।স্বাধীনতার পর কিছু একটা করার ইচ্ছায় ১৯৭২ সালে ৫ জন মিলে ব্যবসা শরু করেছিলেন বর্তমানে ইফাদ গ্রুপের চেয়ারম্যান ও প্রাণপুরুষ ইফতেখার আহমেদ টিপু। কিন্তু বেশি দূর এগোতে পারেননি। ওখান থেকে সরে আসেন। এরপর এদিক-সেদিক অনেক কিছু করেছেন। কোনোটিই তার ভালো লাগেনি। ১৯৮৫ সালে নিজেই শুরু করেন আবার ব্যবসা। এবার ব্যবসা শুরু করেন ধার করা পুঁজিতে। শুরুতে ছোট ভাই, ভগ্নিপতি ও বন্ধুর কাছ থেকে ধার করে মাত্র ৩ লাখ টাকা নিয়ে কাজ শুরু করেন। ইফাদ এন্টারপ্রাইজ নামে শুরুতে মাত্র ১২ জন জনবল নিয়ে ইলেক্ট্রনিক সরঞ্জাম আন্তর্জাতিক টেন্ডারের মাধ্যমে সরবরাহ করতেন। অন্যরা যা কাজ করত নিজে করতেন তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। সেই থেকে যে শুরু আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ১৯৪৯ সালে নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন ইফতেখার আহমেদ। ৭ ভাই ও ২ বোনের মধ্যে সবার বড় তিনি। বাবা জালাল আহমেদ সরকারি চকরিজীবী হওয়ার কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তিনি থেকেছেন। বাবার চাকরিসূত্রে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন রংপুরে। ১৯৫৩ সালে আসেন ঢাকায়। এর পরে ঢাকাতেই বড় হওয়া। দৃঢ়তার সঙ্গে তিনি বলেন, যে কোনো কাজে আন্তরিকতা ও ইচ্ছাশক্তি থাকলে এবং সে লক্ষ্যে শ্রম দিলে মাঝেমধ্যে ব্যর্থতা এলেও এক সময়ে গিয়ে সফলতা আসবেই।

রানার গ্রুপ:
বাবা চাইতেন না ছেলে ব্যবসা করুক। বাবা চাইতেন ছেলেও যেন তার মতো চাকুরি করেন। কারণ ব্যবসা করতে পুঁজি লাগে। সেই পুঁজিইবা দিবেন কিভাবে। বারো জন ছেলে-মেয়ের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হতো বাবা কোরেশ আলী খানকে। তাই পরিবারের কিছুটা দায়িত্ব নিজের কাধে নিতে এবং বাবার কথায় প্রথম কর্মজীবনে হাফিজুর রহমান লেখাপড়া শেষে চাকুরি করলেও চাকুরিতে মন বসাতে পারেননি তিনি। ছোট বেলে থেকেই হাফিজুর রহমান খান ছিলেন স্বপ্নবাজ। স্বপ্ন দেখতেন দেশের একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী হবেন। তাই চাকুরি ছেড়ে নেমে পড়ে ব্যবসায়। পুঁজি না থাকলেও ছিল মেধাশক্তি ও পরিশ্রমের মানসিকতা। তাই ব্যবসার কারণে ছুটেছেন গ্রাম থেকে গ্রামে। আজ তার সেই পরিশ্রমের ফসল রানার মোটরসাইকেল ছুটে চলেছে শহর থেকে গ্রামের মেঠোপথে। শুধু মোটরসাইকেলই নয় চলছে রানার গ্রুপের যানবাহনগুলো। দেশের অটোমোবাইল বাণিজ্যে সুনাম কুড়িয়েছে রানার গ্রুপ। এছাড়াও রিয়েল এস্টেট, কৃষি ও তথ্য খাতে রয়েছে ব্যাপক ভূমিকা। রানার অটোমোবাইলস, রানার এগ্রো কোম্পানি, রানার অটো ব্রিকস ফিল্ড, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, রানার সিসটেমস লিমিটেড, রানার প্রোপার্টিজ ও রানার মোটরস লিমিটেড। রানার প্রুপ বাংলাদেশের ব্যবসায়ী সমাজে সুপরিচিত একটি নামই শুধু নয় বরং সংশ্লিষ্ট সকলের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীকও বটে। ১৯৫৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি মরহুম কোরেশ আলী খান ও মরহুমা পরিজান নেসার কুলে জন্ম নেন হাফিজুর রজমান। নওগাঁ থেকে ম্যাট্রিক ও ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পর ভর্তি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ভর্তি হওয়ার পরই সফল উদ্যোক্ত ও ব্যবসায়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন।অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করে শুরু করেন কর্মজীবন। পুঁজি না থাকায় ব্যবসা করা আর হয়ে না তার। তবুও তিনি হাল ছেড়ে দেননি তিনি। পুঁজি না থাকলে কি হবে, ছিলো তার বুদ্ধি ও অদ্যম সাহস। প্রথম কর্মজীবনে একটি পাঠকলে চাকরি করেন। এই চাকরি ছেড়ে চাকরি নেন শ্যালো মেশিন ও পাম্প বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানে। এই চাকরির মাধ্যমে শিখতে থাকেন ব্যবসায় নানা বিষয়। ১৯৮৩ সালে শেষের দিকে চাকুরি ছেড়ে নেমে পড়লেন ব্যবসায়। সেই সময় তার মূলধন ছিল মাত্র ২০ হাজার টাকা। ২০০০ সালে গড়ে তুলেন রানার অটোমোবাইলস। আমন্ত্রণ জানাতে শুরু করেন দেশের সুপ্রতিষ্ঠিত মোটরসাইকেল ব্যবসায়ীদের। তার ব্যবসার পরিকল্পনা ও উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখে এসব ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করেন তার ব্যবসায়। এ সময় তার পুঁজি হয় ২ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। এই পুঁজি নিয়ে পুরোদমে নেমে পড়েন ব্যবসায়। ব্যবসার শুরুতে চায়না থেকে মোটরসাইকেল আমদানি করে বিক্রি করতেন। এর পাশাপাশি ট্রাক, বাস দেশের বাইরে থেকে এনে বিক্রয় শুরু করেন। মেধা, বুদ্ধি, পরিশ্রম এবং অনেক বাধা উপক্ষো করে তিলতিল করে গড়ে তুলেন রানার গ্রুপ।

কুসুমকলি জুতার কারখানা :
শূন্য থেকে সবকিছু শুরু করে আজ যে মানুষটি সফল হয়েছেন, তিনি বাংলাদেশের নাজমা আক্তার। স্বল্প বেতনে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার পাশাপাশি সমিতি থেকে মাত্র ২০ হাজার টাকা নিয়ে এক রুম ভাড়া করে জুতার কারখানা দিয়েছিলেন। ২ জন কর্মী নিয়ে শুরু করা সেই কারখানার শাখা এখন দেশের বাইরেও আছে! ব্যাংক থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ পুঁজি করে যে প্রতিষ্ঠান তিনি দাঁড় করিয়েছেন, সেটি এখন আড়াই কোটি টাকার প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর হয়েছে। পুরো কারখানা পুড়ে যাওয়ার পরও দৃঢ় মনোবল নিয়ে তিনি দ্বিতীয়বারের মতো আবার নতুন করে শুরু করতে পেরেছেন। ইচ্ছা আর আত্মবিশ্বাস থাকলে যে শূন্য থেকে শীর্ষে পৌঁছানো যায়, এই সমাজে তার বড় প্রমাণ নাজমা আক্তার।